দায়মোচন

--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিরকাল রবে মোর প্রেমের কাঙাল,
     এ কথা বলিতে চাও বোলো।
এই ক্ষণটুকু হোক সেই চিরকাল -
     তার পরে যদি তুমি ভোল
মনে করাব না আমি শপথ তোমার,
আসা যাওয়া দু দিকেই খোলা রবে দ্বার -
যাবার সময় হলে যেয়ো সহজেই,
     আবার আসিতে হয় এসো।
সংশয় যদি রয় তাহে ক্ষতি নেই,
     তবু ভালোবাস যদি বেসো।।

বন্ধু, তোমার পথ সম্মুখে জানি,
     পশ্চাতে আমি আছি বাঁধা।
অশ্রুনয়নে বৃথা শিরে কর হানি
     যাত্রায় নাহি দিব বাধা।
আমি তব জীবনের লক্ষ্য তো নহি,
ভুলিতে ভুলিতে যাবে হে চিরবিরহী,
তোমার যা দান তাহা রহিবে নবীন
     আমার স্মৃতির আঁখিজলে -
আমার যা দান সেও জেনো চিরদিন
     রবে তব বিস্মৃতিতলে।।

দূরে চলে যেতে যেতে দ্বিধা করি মনে
     যদি কভু চেয়ে দেখ ফিরে,
হয়তো দেখিবে আমি শূন্য শয়নে -
     নয়ন সিক্ত আঁখিনীরে।
মার্জনা কর যদি পাব তবে বল,
করুণা করিলে নাহি ঘোচে আঁখিজল -
সত্য যা দিয়েছিলে থাক্ মোর তাই,
     দিবে লাজ তার বেশি দিলে।
দুঃখ বাঁচাতে যদি কোনোমতে চাই
     দুঃখের মূল্য না মিলে।।

দুর্বল ম্লান করে নিজ অধিকার
     বরমাল্যের অপমানে।
যে পারে সহজে নিতে যোগ্য সে তার,
     চেয়ে নিতে সে কভু না জানে।
প্রেমেরে বাড়াতে গিয়ে মিশাব না ফাঁকি,
সীমারে মানিয়া তার মর্যাদা রাখি -
যা পেয়েছি সেই মোর অক্ষয় ধন,
     যা পাই নি বড়ো সেই নয়।
চিত্ত ভরিয়া রবে ক্ষণিক মিলন
     চিরবিচ্ছেদ করি জয়।।


আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি   বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে।
      আজি   খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,
      আজি   ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,
      এই    সংগীতমুখরিত গগনে
      তব    গন্ধ করঙ্গিয়া তুলিয়ো।
      এই    বাহিরভূবনে দিশা হারায়ে
      দিয়ো   ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।
অতি   নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে
আজি   পল্লবে পল্লবে বাজে রে -
দূরে   গগনে কাহার পথ চাহিয়া
আজি ব্যকুল বসুন্ধরা সাজে রে।
      মোর   পরানে দখিন বায়ু লাগিছে,
      কারে   দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে,
      এই    সৌরভবিহবল রজনী
      কার   চরণে ধরণীতলে জাগিছে।
      ওগো   সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,
      তব   গম্ভীর আহবান কারে।


ঝুলন

ঝুলন
--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 
 আমি   পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা
              নিশীথবেলা।
       সঘন বরষা, গগন আঁধার
       হেরো বারিধারে কাঁদে চারিধার---
       ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা;
       বাহির হয়েছি স্বপ্নশয়ন করিয়া হেলা
              রাত্রিবেলা॥

 ওগো,   পবনে গগনে সাগরে আজিকে কী কল্লোল!
              দে দোল্ দোল্।
       পশ্চাত্‍‌ হতে হাহা ক'রে হাসি
       মত্ত ঝটিকা ঠেলা দেয় আসি,
       যেন এ লক্ষ যক্ষশিশুর অট্টরোল।
       আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে হট্টগোল!
              দে দোল্ দোল্।

 আজি   জাগিয়া উঠিয়া পরান আমার বসিয়া আছে
              বুকের কাছে।
       থাকিয়া থাকিয়া উঠিছে কাঁপিয়া,
       ধরিছে আমার বক্ষ চাপিয়া,
       নিঠুর নিবিড় বন্ধনসুখে হৃদয় নাচে;
       ত্রাসে উল্লাসে পরান আমার ব্যাকুলিয়াছে
              বুকের কাছে॥

 হায়,   এতকাল আমি রেখেছিনু তারে যতনভরে
              শয়ন-'পরে।
       ব্যথা পাছে লাগে---- দুখ পাছে জাগে
       নিশিদিন তাই বহু অনুরাগে
       বাসরশয়ন করেছি রচন কুসুমথরে;
       দুয়ার রুধিয়া রেখেছিনু তারে গোপন ঘরে
              যতনভরে॥

 কত    সোহাগ করেছি চুম্বন করি নয়নপাতে
              স্নেহের সাথে।
       শুনায়েছি তারে মাথা রাখি পাশে
       কত প্রিয়নাম মৃদুমধুভাষে,
       গুঞ্জরতান করিয়াছি গান জ্যোত্‍‌স্নারাতে;
       যা-কিছু মধুর দিয়েছিনু তার দুখানি হাতে
              স্নেহের সাথে॥

 শেষে   সুখের শয়নে শ্রান্ত পরান আলসরসে
              আবেশবশে।
       পরশ করিলে জাগে না সে আর,
       কুসুমের হার লাগে গুরুভার,
       ঘুমে, জাগরণে মিশি একাকার নিশিদিবসে
       বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ মরমে পশে
              আবেশবশে॥

 ঢালি   মধুরে মধুর বধূরে আমার হারাই বুঝি,
              পাই নে খুঁজি।
       বাসরের দীপ নিবে নিবে আসে,
       ব্যাকুল নয়ন হেরি চারি পাশে
       শুধু রাশি রাশি শুষ্ক কুসুম হয়েছে পুঁজি;
       অতল স্বপ্নসাগরে ডুবিয়া মরি যে যুঝি
              কাহারে খুঁজি॥

 তাই   ভেবেছি আজিকে খেলিতে হইবে নূতন খেলা
              রাত্রিবেলা
       মরণদোলায় ধরি রশিগাছি
       বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি,
       ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা;
       আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে ঝুলনখেলা
              নিশীথবেলা॥

            দে দোল্ দোল্।
            দে দোল্ দোল্।
          এ মহাসাগরে তুফান তোল্
       বধূরে আমার পেয়েছি আবার, ভরেছে কোল।
       প্রিয়ারে আমার তুলেছে জাগায়ে প্রলয়রোল।
       বক্ষশোণিতে উঠেছে আবার কী হিল্লোল!
       ভিতরে বাহিরে জেগেছে আমার কী কল্লোল!
          উড়ে কুন্তল, উড়ে অঞ্চল,
          উড়ে বনমালা বায়ুচঞ্চল,
       বাজে কঙ্কণ বাজে কিঙ্কিণী--- মত্তরোল।
              দে দোল্ দোল্।

       আয় রে ঝঞ্ঝা, পরানবধূর
       আবরণরাশি করিয়া দে দূর,
       করি লুণ্ঠন অবগুণ্ঠন-বসন খোল্।
              দে দোল্ দোল্।

       প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ
       চিনি লব দোঁহে ছাড়ি সব লাজ,
       বক্ষে বক্ষে পরশিব দোঁহে ভাবে বিভোল।
              দে দোল্ দোল্।
       স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরিছে আজ দুটি পাগল।
              দে দোল্ দোল্।

কৃষ্ণকলি

--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, 
        কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলাদিনে দেখেছিলেম মাঠে 
        কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে, 
মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
        কালো? তা সে যতই কালো হোক, 
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে 
        ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে 
        কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু 
শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
        কালো? তা সে যতই কালো হোক, 
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

পূবে বাতাস এল হঠাত্‍‌ ধেয়ে,
        ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,
        মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,
আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
        কালো? তা সে যতই কালো হোক,
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

এমনি করে কাজল কালো মেঘ 
        জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
        আষাঢ়মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে
হঠাত্‍‌ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
        কালো? তা সে যতই কালো হোক,
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, 
        আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে
        কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,
লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।
        কালো? তা সে যতই কালো হোক,
        দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

চির-আমি

--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যখন     পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা-কেনা,     মিটিয়ে দেব লেনা-দেনা
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে -
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।
যখন     জমবে ধুলা তানপুরাটার তারগুলায়,
কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়,
ফুলের বাগান ঘন ঘাসের     পরবে সজ্জা বনবাসের,
শ্যাওলা এসে ঘিরবে দিঘির ধারগুলায় -
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।
যখন     এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে,
কাটবে গো দিন যেমন আজও দিন কাটে।
ঘাটে ঘাটে খেয়ার তরী     এমনি সেদিন উঠবে ভরি,
চরবে গোরু, খেলবে রাখাল ওই মাঠে।
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।
তখন     কে বলে গো, সেই প্রভাতে নেই আমি?
সকল খেলায় করবে খেলা এই-আমি।
নতুন নামে ডাকবে মোরে,     বাঁধবে নতুন বাহুর ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই-আমি।
আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।।

শেষের কবিতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্য উধাও।
জাগিছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন
চক্রে পিষ্ট আধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল
তুলে নিল দ্রুতরথে
দু'সাহসী ভ্রমনের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়;
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
কোনদিন কর্মহীন পূর্ণো অবকাশে
বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যাথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রানে, বিস্মৃতি প্রাদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা স্বপ্নে মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর সেই মৃত্যুঞ্জয় -
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলাম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু বিদায়।
তোমায় হয় নি কোন ক্ষতি।
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক তাহারি আরতি
হোক তবে সন্ধ্যা বেলা-
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট্র নাহি হবে তার কোন ফুল নৈবদ্যের থালে।
তোমার মানস ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর ত'ষায়
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে বচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নবিষ্ট তোমার বচন
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু বিদায়।
মোর লাগি করিয় না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শুন্যেরে করিব পূর্ণো, এই ব্রত বহিব সদাই।

উ'কন্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সে ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপখক হতে আনি
রজনী গন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে
সে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করূন মুহূর্তগুলি গন্ডুষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম,
ওগো নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।

যাবার দিন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই -
যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে     যে শতদল পদ্ম রাজে
তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।
যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।
বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই গেলেম খেলে,
অপরূপকে দেখে গেলেম দুটি নয়ন মেলে।
পরশ যাঁরে যায় না করা     সকল দেহে দিলেন ধরা,
এইখানে শেষ করেন যদি শেষ করে দিন তাই -
যাবার বেলা এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।